• মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়

দরখাস্ত লেখার জ্ঞান না থাকলেও সাংবাদিকরা জনপ্রতিনিধি বানাতে মরিয়া

Un24admin
আপডেটঃ : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। একসময় মানুষ সাংবাদিককে সমাজের দর্পণ, গণতন্ত্রের আয়না এবং রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু ধীরে ধীরে এই মহান পেশাটি এমন এক নিম্নমুখী অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে, যা সচেতন মহলে উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

একসময় দেশপ্রেমিক, জ্ঞানী, সৎ ও বিবেকবান মানুষের কাছে সাংবাদিকতা ছিল একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে এই পেশার প্রতি যোগ্য ও সৎ মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ অপরাধ করে পুলিশের হয়রানি থেকে বাঁচতে সাংবাদিকতার পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও চাঁদাবাজি কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আড়াল বা বৈধতা দেওয়ার জন্য গণমাধ্যম ও তথ্যের অপব্যবহারের অভিযোগও উঠছে। অতিরিক্ত লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে একটি শিক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—নতুন প্রজন্মের অনেক গণমাধ্যমকর্মী পেশায় টিকে থাকা ও প্রভাবশালী হওয়ার প্রতিযোগিতায় এমন ব্যক্তিদের প্রচার-প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন, যাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ আবার সেই ব্যক্তিদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছেন।

একজন ডিগ্রি বা মাস্টার্স পাস শিক্ষিত গণমাধ্যমকর্মীকে যখন ক্যামেরা হাতে এমন ব্যক্তির সামনে দাঁড়িয়ে তার গুণকীর্তন করতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সাংবাদিকতার মর্যাদা কোথায়? একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে ‘শিক্ষাবিদ’, ‘সামাজিক ব্যক্তিত্ব’, ‘ন্যায়পরায়ণ’ ও ‘সৎ’ হিসেবে উপস্থাপনের আগে সাংবাদিক কি তার অতীত, শিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও জনসম্পৃক্ততার বিষয়ে যথাযথ অনুসন্ধান করেছেন?

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সাংবাদিক সম্মানহানি, সম্পর্ক নষ্ট হওয়া কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা হারানোর আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে সাহস পান না। অথচ একজন সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিকে প্রশ্ন করা উচিত—নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকারি দপ্তরে দরখাস্ত করতে হলে আপনি কি নিজে একটি সঠিক দরখাস্ত লিখতে জানেন?

জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে আল্লাহ ও নিজের বিবেকের সন্তুষ্টির জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আপনি কী ধরনের সহযোগিতা করেছেন? অসহায় মানুষের পাশে কতবার দাঁড়িয়েছেন? আপনার কাছে একজন শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ চরিত্রের সনদ নিতে গেলে তিনি গর্ববোধ করবেন, নাকি লজ্জাবোধ করবেন?

এসব প্রশ্ন করার সাহস না থাকলে সাংবাদিকতা কেবল প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়। সাংবাদিকের কাজ কারও অন্ধ প্রশংসা করা নয়; বরং সত্য অনুসন্ধান করা, প্রশ্ন করা এবং জনগণের সামনে বাস্তবতা তুলে ধরা।

মানুষ হলে জানতে হবে, আর জানতে হলে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্নহীনতা যেমন সাংবাদিকতার মৃত্যু ডেকে আনে, তেমনি অন্ধ ভক্তিও সমাজের জন্য মরণব্যাধি ক্যানসারের মতো ক্ষতিকর। তাই সাংবাদিকতার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে গণমাধ্যমকর্মীদের ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য, ন্যায়, নীতি ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

জনপ্রতিনিধি বানানোর আগে একজন মানুষের প্রচার নয়, তার যোগ্যতা, সততা, শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, অতীত কর্মকাণ্ড ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা যাচাই করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব। কারণ জনগণের ভোটে একজন ভুল ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর দায় শেষ পর্যন্ত শুধু ভোটারের নয়—তাকে যারা অন্ধভাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখেন, তাদেরও।

লেখক
মো. আয়ুব মিয়াজী
নির্যাতিত গণমাধ্যমকর্মী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের আহত যোদ্ধা
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, আয়ুব মিয়াজী কম্পিউটার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (৭০১৯৫)
নাছির প্লাজা, দোহাজারী পৌরসভা, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ