বিশ্ব ডেস্ক রিপোর্টঃ মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও ইরানকে ঘিরে সামরিক এবং কূটনৈতিক টানাপোড়নের প্রেক্ষাপটে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে তার মিত্র কাতার ও ইসরায়েলের কাছে বিলিয়ন ডলারের উন্নত অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ জোরদার করে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে।
একই সময়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়ন, জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে মতবিরোধ। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থির পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও রাজনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
জানা যায়, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে উপসাগরীয় মিত্র কাতারের কাছে চার বিলিয়ন (৪০০ কোটি) মার্কিন ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
একই সঙ্গে ইসরায়েলের কাছে প্রায় এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রব্যবস্থা বা প্রিসিশন ওয়েপন সিস্টেম বিক্রিরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১ মে) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কংগ্রেসকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, এ দুই দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের ‘পররাষ্ট্র নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার’ লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কাতার ও ইসরায়েলকে এই উন্নত সমরাস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মার্কিন আইন অনুযায়ী, এ ধরনের বড় অঙ্কের অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
এদিকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধে ৪৫টি জাহাজ ঘুরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তাদের দাবি, এসব জাহাজ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল।
ইরানের সঙ্গে চলা যুদ্ধের দায়িত্বে থাকা সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, মার্কিন বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল অব্যাহত রেখেছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলা নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। ৪৫টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা বন্দরে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাতে অবরোধের নিয়ম নিশ্চিত থাকে।
যুদ্ধের মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। শুক্রবার পেন্টাগন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান দূরত্বের মধ্যেই ন্যাটো মিত্র জার্মানির বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নিল ওয়াশিংটন। কয়েক দিন আগে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে তিক্ত বাক্যবিনিময়ের পর দেশটি থেকে সেনা সরিয়ে আনার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
দুই মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনায় ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপমান’ করছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর। মূলত এর জেরেই ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আগামী ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে এই সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে লেবাননে হামলা চালিয়েই যাচ্ছে ইসরায়েল। দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিহ ও সিডন এলাকায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) এ তথ্য জানিয়েছে।
নাবাতিহ এলাকার হাবুশ শহরে চালানো ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে এক শিশু ও দুই নারী রয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ হামলায় আরও ২১ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে সিডনের জরাইরিয়াহ শহরে পৃথক ইসরায়েলি হামলায় আরও চার জন নিহত হয়েছেন। এনএনএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুই নারী রয়েছেন। সেখানে আহত হয়েছেন আরও ৪ জন।
এদিকে ইরান যুদ্ধে জড়ানোকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্ত মনে করেন অনেক মার্কিনি।
ওয়াশিংটন পোস্ট/এবিসি নিউজ/ইপসোস প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার করা একটি ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত ছিল।
ওয়াশিংটন পোস্ট উল্লেখ করেছে, এই জনমত ২০০৬ সালের মে মাসে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে করা এক জরিপের প্রায় সমান। ওই সময় ৫৯ শতাংশ মার্কিনি ইরাক যুদ্ধকে ভুল বলেছিলেন।
এ ছাড়া ১৯৭১ সালের এক গ্যালপ জরিপে দেখা গিয়েছিল, প্রতি ১০ জন মার্কিনির মধ্যে ছয়জনই ভিয়েতনাম যুদ্ধকে একই রকম ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
বর্তমান জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে নয় জন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে ভুল মনে করছেন। এ ছাড়া ৭১ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার এবং ১৯ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থকও একই মত পোষণ করেছেন।
সর্বশেষ যুদ্ধ বন্ধে ইরানের প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরান আদৌ কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) একটি চুক্তি করতে চায়। কিন্তু আমি এতে সন্তুষ্ট নই।’
ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের ঠিক কোন বিষয়টি তিনি গ্রহণ করতে পারছেন না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের কর্মকর্তারা হয়তো কখনোই আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী মীমাংসায় পৌঁছাতে পারবেন না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তারা (ইরান) কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তারা শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। এ সময় তিনি ইরানের নেতাদের মধ্যে ‘প্রচণ্ড মতভেদ’ রয়েছে বলেও দাবি করেন।