নূরে আলম জীবনঃঃ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস নামে দিবসটির তাৎপর্য। প্রতি বছর পয়লা মে তারিখে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদ্যাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। ভারত ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়।
দিবসটি কেন্দ্র করে পৃথিবীর প্রায় শতাধিক দেশে রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারীভাবে নানা আয়োজনে দিবসটি উৎযাপিত হলেও যথাযথ শ্রমিকের ঘামের ন্যায্য পারিশ্রমিক, স্বাস্থ্যসেবা, দূর্ঘটনা জনিত ক্ষতিপূরণ, শিশুশ্রম বন্ধ না হওয়াসহ নানাবিধ সমস্যা ২০২৬ সালে এসেও বিদ্যমান।
একটি দেশ বা রাষ্ট্রের চালিকাশক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থর জনশক্তি। জ্ঞানী বেকারের চেয়ে পরিশ্রমী অশিক্ষিত যুবক পরিবার ও সমাজের কল্যাণকর। তবে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষিত মানুষ কখনো পরিশ্রমকে অবহেলা করতে পারে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এক দশক ধরেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ থেকে ২৭ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে।
১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৭ লাখ বেকার। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে শ্রমিক হিসেবে বাঙালিরা কাজ করছেন। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন। বাংলাদেশে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ নিজের পছন্দ মতো কাজ পান না। তারা পড়াশোনা করেন না, কাজেও নেই। তাঁরা ছদ্মবেকার। কোনো রকম জীবনধারণের জন্য টুকটাক কাজ করেন।
প্রতিবছর কমপক্ষে ২০-২২ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ বিদেশ কর্মসংস্থান। বাকি ১৪-১৫ লাখ দেশে কর্মসংস্থান হয়। বেকারের সংখ্যা যেহেতু প্রায় অপরিবর্তিত থাকে, এর মানে, প্রতিবছর যত তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, ঠিক তত সংখ্যক কর্মসংস্থান হয় বাজারে।
আবার সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে, সরকার যে হিসাব দেয়, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।
২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে বিবিএসের হিসাবে, বাংলাদেশে এখন বেকার লোকের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ।
বিবিএস এখন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রমশক্তি জরিপ করে থাকে। ফলে মৌসুমি বেকারদের চিত্র উঠে আসে। বিবিএসের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক হিসাবে, সংজ্ঞা অনুসারে গত সেপ্টেম্বর মাস শেষে ২৬ লাখ ৬০ হাজার বেকার আছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল। কারণ, শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব হার সবচেয়ে বেশি। এ হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
নানাবিধ কারণে সরকারের শিশুশ্রম বন্ধে আইন থাকলেও কিন্তু শিশুশ্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। শিশুদের শ্রমিক হওয়ার পিছনে পরিবারের অবহেলা, পরিবারের কর্মজীবী কেউ না থাকা, এতিম, পথশিশুসহ ঝড়ে পরা শিশুরাই শ্রমিকের চাঁদর গায়ে জড়াচ্ছে।
উল্লেখ্যঃ ১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিনের দাবীতে আন্দোলন রত শ্রমিকের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় এইদিন পালিত হয় না। এ ছাড়া এইদিনে আরও কিছু ঘটনা রয়েছে যা আঞ্চলিক ভাবে হয়তো পালিত হয়।
পূর্বে শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রম করতে হত, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন। বিপরীতে মজুরী মিলত নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত, ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নিল না। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। আগস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎক্ষনাত শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্যএকজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, “আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে”। ২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের “দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার” দাবী অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে, পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়।
শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের উক্ত গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণ করে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছরের ১লা মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে “মে দিবস” বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস”। পহেলা মে সেই আন্দোলনের কথাই আমাদের স্বরণ করিয়ে দেয়। ১৮৯০ সালের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিষ্ট কংগ্রেসে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয় এবং তখন থেকে অনেক দেশে দিনটি শ্রমিক শ্রেনী কর্তৃক উদযাপিত হয়ে আসছে। রাশিয়াসহ পরবর্তীকালে আরো কয়েকটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হবার পর মে দিবস এক বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শাখা হিসাবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (অরগানাইজেশন বা আই .ত্রল.ও) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার সমূহ স্বীকৃতি লাভ করে এবং সকল দেশে শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের তা মেনে চলার আহবান জানায়। এভাবে শ্রমিক ও মালিকদের অধিকার সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশ আই.এল.ও কর্তৃক প্রণীত নীতিমালার স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেনীর প্রাধান্যের কারনে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক দেশে বেশ গুরুত্বও সংকল্প সহকারে মে দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে মে দিবসে সরকারি ছুটি পালিত হয়। এখানে বেশ উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে মে দিবস পালিত হয়।