ব্যাংক-বীমা ডেস্ক রিপোর্টঃ প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অতীতে দেশের বিমা খাতকে একটি কমিশননির্ভর ব্যবসার খাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকির অভাব, দুর্বল জবাবদিহিতা এবং কিছু অসাধু গোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে এ খাত দীর্ঘদিন ধরে জনগণের আস্থা হারিয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিমা খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বাজেট-পরবর্তী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, একসময় বিমা খাতে কোনো কার্যকর রেগুলেটরি ওভারসাইট ছিল না। ফলে এটি এমন একটি খাতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে কিছু ব্যক্তি সাধারণ বিমা ও পুনর্বিমা (রিইন্স্যুরেন্স) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে দুর্ঘটনা না ঘটলেও বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা নিতেন। তিনি জানান, একটি বিমা কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এ খাতের নানা দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করেছেন।
Ads 11
তিনি বলেন, অনেক বিমা প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত সম্পদ বা শক্তিশালী বিনিয়োগ বিভাগ নেই। বিশেষ করে জীবন বিমা খাতের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশে কৃষি বিমার প্রসার অত্যন্ত জরুরি হলেও লাভজনক না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এ খাতে আগ্রহ দেখায় না। অথচ কৃষকদের জন্য কার্যকর বিমা ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে জনগণের আস্থা বাড়বে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় বিমা কভারেজ অত্যন্ত সীমিত, যা একটি বড় কাঠামোগত সংকট। টেকসই মুনাফা নিশ্চিত করতে হলে বিমা কোম্পানিগুলোকে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে হবে। কৃষি বিমার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিমাসহ নতুন নতুন পণ্য চালুর মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্য বিমা মূলত উচ্চবিত্ত ও সীমিতসংখ্যক চাকরিজীবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না থাকায় একদিকে গ্রাহকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একইভাবে সড়ক পরিবহনে মানুষের জীবনের ঝুঁকি থাকলেও যানবাহনভিত্তিক বিমা ব্যবস্থাও এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ড. তিতুমীর বলেন, জনগণের আস্থা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশের রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ফলে ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজারসহ পুরো আর্থিক খাতেই নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বিমা খাত সংস্কারে পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। এগুলো হলো—খাতে লুটপাট ও অনিয়ম বন্ধ করা, কৃষি বিমাসহ বিমা সেবার বিস্তৃতি ঘটানো, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা ও গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিত করা, সার্ভেয়ার, অডিটর, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিসহ বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রকদের কার্যকর করা এবং শক্তিশালী কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, সরকার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করে না। তবে এমন একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যা বিমা খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, গ্রাহকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং দেশের মানুষের মধ্যে বিমা গ্রহণের পরিধি বাড়াবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, বিমা খাতে ন্যায্যতার বড় অভাব, অধিকারের বড় অভাব এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণেরও বড় অভাব রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।