— একটি বিশ্লেষণধর্মী কলাম —
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির কারণে এই সম্পর্ককে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সব সময় সহজ সম্পর্ক হয় না। বরং অনেক সময় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর সঙ্গেই সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলো তৈরি হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে এককথায় শত্রুতাপূর্ণ বলা যাবে না। আবার এটিকে স্বাভাবিক ও উষ্ণ সম্পর্ক বলাও কঠিন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক বক্তব্যে সম্পর্ককে **পুনর্বিন্যাস, পুনর্গঠন এবং নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা** স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন পারস্পরিক সম্মান, আস্থা, মর্যাদা ও সার্বভৌম সমতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় ছোট রাষ্ট্র বলেই কি তাকে সবসময় ভারতের প্রতি নমনীয় থাকতে হবে?
এর উত্তর হওয়া উচিত—**না।**
—
## ছোট রাষ্ট্র, কিন্তু ছোট সার্বভৌমত্ব নয়
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি, অর্থনীতির আকার ও জনসংখ্যা সমান নয়। ভারত নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম শক্তি। বাংলাদেশের তুলনায় তার সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা অনেক বেশি।
কিন্তু একটি মৌলিক সত্য রয়েছে—
> **রাষ্ট্রের আকার ছোট হতে পারে, কিন্তু তার সার্বভৌমত্ব ছোট হয় না।**
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং পররাষ্ট্রনীতির অধিকার রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের নীতি এমন হতে পারে না—
**“ভারত বড়, তাই ভারত যা চাইবে বাংলাদেশকে তা মেনে নিতে হবে।”**
আবার এটিও বাস্তবসম্মত নয়—
**“ভারত বড়, তাই বাংলাদেশের নীতি হবে ভারতবিরোধিতা।”**
রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রয়োজন **ভারতবিরোধী নীতি নয়; আবার ভারতনির্ভর নীতিও নয়।**
প্রয়োজন একটি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি।
—
# সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা: শীতলতা আছে, বিচ্ছিন্নতা নয়
বর্তমান বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত ও সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে।
এমনকি সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায়ও **“সার্বভৌম সমতা” ও “পারস্পরিক স্বার্থ”**কে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, সম্পর্কের ভাষা এখন শুধু—
**“ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব”**
নয়।
নতুন প্রশ্ন হচ্ছে—
* পারস্পরিক সম্মান কতটা আছে?
* জাতীয় স্বার্থ কতটা বিবেচিত হচ্ছে?
* আস্থার সংকট কীভাবে দূর হবে?
* দুই দেশ কি একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করছে?
* সহযোগিতার সুবিধা কি উভয় দেশের জন্য সমানভাবে দৃশ্যমান?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দিনের সম্পর্ক নির্ধারণ করবে।
—
# বাংলাদেশ কি নিজস্ব পলিসি স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করতে পারে?
অবশ্যই পারে।
এটি শুধু বাংলাদেশের অধিকার নয়—এটি যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষণায় ছোট রাষ্ট্রগুলো কেবল বড় শক্তির অনুসারী হয়—এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত বলা হয় না। ছোট রাষ্ট্রও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, ভারসাম্য ও কৌশলগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশকে নিয়ে পরিচালিত গবেষণাতেও দেখা গেছে, তুলনামূলকভাবে ছোট ও দুর্বল অর্থনৈতিক-সামরিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে পারে।
এটিই মূলত—
## **Strategic Autonomy**
### বা কৌশলগত স্বাধীনতা।
এর অর্থ কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।
বরং অর্থ হলো—
> **নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।**
—
# বাংলাদেশ কি শুধু ভারতের ওপর নির্ভর করবে?
একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রের জন্য একক নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ কৌশল নয়।
বাংলাদেশের উচিত সম্পর্কের বহুমুখীকরণ।
অর্থাৎ—
### ভারতের সঙ্গে
প্রতিবেশীসুলভ সহযোগিতা ও স্থিতিশীল সম্পর্ক।
### চীনের সঙ্গে
অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা।
### যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
### জাপানের সঙ্গে
দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব।
### দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে
বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগ।
### অন্যান্য দেশের সঙ্গে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ।
সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বাংলাদেশের বহুমুখী অংশীদার খোঁজা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সেখানে ভারতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ—
> **ভারতের গুরুত্ব কমানো নয়; বাংলাদেশের বিকল্প সক্ষমতা বাড়ানো।**
এ দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
—
# ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ চাইলে ভারতকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করতে পারবে না।
কারণ—
* দুই দেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে
* নদী ও পানির প্রশ্ন রয়েছে
* সীমান্ত নিরাপত্তা রয়েছে
* বাণিজ্য রয়েছে
* বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা রয়েছে
* যোগাযোগ ও ট্রানজিটের প্রশ্ন রয়েছে
* উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে
অর্থাৎ—
> **ভূগোল পরিবর্তন করা যায় না।**
সরকার পরিবর্তিত হয়।
রাজনীতি পরিবর্তিত হয়।
কিন্তু প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না।
সেই কারণে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো **স্থিতিশীলতা**।
কিন্তু স্থিতিশীলতার অর্থ একতরফা ছাড় নয়।
স্থিতিশীলতা আসতে হলে উভয় পক্ষকেই পারস্পরিক উদ্বেগ ও সংবেদনশীলতা গুরুত্ব দিতে হবে।
—
# বন্ধুত্ব বনাম নির্ভরতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল প্রায়ই দেখা যায়।
সেটি হলো—
### বন্ধুত্ব এবং নির্ভরতাকে একই জিনিস মনে করা।
দুটি এক নয়।
একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে—
* সব বিষয়ে একই অবস্থান নিতে হবে
* জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে
* অন্য দেশের পছন্দ অনুযায়ী তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে—
> **নিজের বন্ধু নিজে নির্বাচন করার।**
তবে একই সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে—
> **নিজের ভূখণ্ড কোনো প্রতিবেশীর বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হতে দেওয়ার।**
সুস্থ প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত—
### নিরাপত্তা + সার্বভৌমত্ব + পারস্পরিক স্বার্থ।
—
# বাংলাদেশের জন্য কী হতে পারে নতুন পররাষ্ট্রনীতির সূত্র?
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে—
## **Strategic Cooperation, Strategic Autonomy**
বাংলায়—
# **কৌশলগত সহযোগিতা, কিন্তু নীতিগত স্বাধীনতা।**
এই নীতির অধীনে বাংলাদেশ—
### ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করবে
কিন্তু ভারতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হবে না।
### চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক করবে
কিন্তু কোনো শক্তির প্রক্সি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
### যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক করবে
কিন্তু অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না।
### বহুপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলবে
কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখবে।
এটাই একটি পরিণত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য।
—
# সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত কী?
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে আগামী দিনে পাঁচটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে।
১. সার্বভৌম সমতা
বড় ও ছোট রাষ্ট্রের ক্ষমতা সমান নয়।
কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মান থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশকে শুধু ছোট প্রতিবেশী হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হবে।
—
২. পারস্পরিক স্বার্থ
যে সম্পর্ক শুধু একটি পক্ষকে সুবিধা দেয়, সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
উভয় দেশকেই অনুভব করতে হবে—
> **এই সম্পর্ক থেকে আমরা দুজনেই লাভবান হচ্ছি।**
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন যে টেকসই সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে হয়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
—
৩. পারস্পরিক সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা, জনমত এবং সার্বভৌম উদ্বেগকে উপেক্ষা করলে কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়ে।
রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক শুধু সরকার থেকে সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
**মানুষের ধারণা ও জনমতও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।**
—
৪. সমস্যার সমাধানে নিয়মিত সংলাপ
দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে।
এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সমস্যা সমাধানের পথ হওয়া উচিত—
*হুমকি নয়
*প্রচারযুদ্ধ নয়
*একতরফা সিদ্ধান্ত নয়
বরং—
### সংলাপ
### কূটনীতি
### পারস্পরিক আলোচনা
৫. সম্পর্ককে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সীমাবদ্ধ না রাখা
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক হতে হবে—
> **বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রের সম্পর্ক।**
কোনো একটি রাজনৈতিক দল, সরকার বা ব্যক্তির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে সম্পর্ককে যুক্ত করে ফেললে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও সংকটে পড়ে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন—
### Institutional Relationship
অর্থাৎ—
**প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির সম্পর্ক নয়।**
—
# ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার জনসংখ্যা বা অর্থনীতি নয়।
বাংলাদেশের রয়েছে—
### গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান
### বঙ্গোপসাগরীয় গুরুত্ব
### দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ
### বড় বাজার
### তরুণ জনগোষ্ঠী
### আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার
### বহুপক্ষীয় কূটনীতির সম্ভাবনা
ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র অনেক সময় সামরিক শক্তি নয়।
বরং—
> **স্মার্ট কূটনীতি।**
সঠিক কূটনীতি ছোট রাষ্ট্রকে তার আকারের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
—
# বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল কী হতে পারে?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল হবে দুটি চরম অবস্থানের যেকোনো একটিতে চলে যাওয়া।
### প্রথম চরমতা:
**অতিরিক্ত ভারতনির্ভরতা।**
### দ্বিতীয় চরমতা:
**অন্ধ ভারতবিরোধিতা।**
দুটিই জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আবেগ দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না।
আজকের বন্ধু আগামীকাল প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে।
আজকের প্রতিদ্বন্দ্বী আগামীকাল গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
তাই রাষ্ট্রের স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
> **স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ।**
—
# নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান
বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।
কিন্তু আত্মবিশ্বাস মানে সংঘাত সৃষ্টি করা নয়।
আত্মমর্যাদা মানে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি মানে কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে জোট গঠন করা নয়।
বরং—
> **বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে।**
এটাই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অধিকার।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায়ও পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
—
# উপসংহার: বাংলাদেশ কী চায়?
বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে শত্রুতা প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশের প্রয়োজন **সম্মানজনক বন্ধুত্ব**।
বাংলাদেশের প্রয়োজন **পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা**।
বাংলাদেশের প্রয়োজন **নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা**।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
> **বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু কারও অধীনস্থ নয়।**
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে—
### সহযোগিতার,
কিন্তু আত্মসমর্পণের নয়।
### বন্ধুত্বের,
কিন্তু নির্ভরতার নয়।
### বাস্তববাদের,
কিন্তু অন্ধ আনুগত্যের নয়।
### পারস্পরিক স্বার্থের,
কিন্তু একতরফা সুবিধার নয়।
বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র হতে পারে।
কিন্তু—
# **বাংলাদেশ কোনো ছোট জাতি নয়।**
১৯৭১ সালে এই দেশ তার স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো—বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের বন্ধু, নিজের অর্থনৈতিক অংশীদার এবং নিজের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের অধিকার রাখে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তাই হওয়া উচিত—
> ## **সমতার মর্যাদায় বন্ধুত্ব, পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা এবং স্বাধীন সত্তায় কূটনীতি।**
**বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক দর্শন হতে পারে—**
### বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে।
### সহযোগিতা পারস্পরিক স্বার্থে।
### সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে।
### নির্ভরতা কোনো একক শক্তির ওপর নয়।
### সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
**কারণ, রাষ্ট্র ছোট হতে পারে—কিন্তু তার স্বাধীন সিদ্ধান্তের অধিকার ছোট হতে পারে না।** মোঃ আলী হোসেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও অনলাইন একটিভিস্ট, সাবেক শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মোঃ আলী হোসেন
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক রাজনীতি বিশ্লেষক।
অনলাইন একটিভিস্ট।