• সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১২ অপরাহ্ন

বর্ষার আগমন ও আমাদের করণীয়

Un24admin
আপডেটঃ : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

নূরে আলম জীবনঃঃ বর্ষা একটি ক্লান্ত অধ্যায়ের তৃপ্তি প্রলয়। এই বর্ষার অন্তরালেই একজন কৃষকের হাসি এবং কান্না বিরাজ করে। পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে বর্ষার প্রলয় ধ্বংস নিয়ে আসে। আবার ভেঙে যাওয়া খেতে বর্ষার পানি আল্লাহর রহমত হয়ে জীবন্ত করে দেয় মৃত ক্ষেতটিকে। গ্রীষ্মের বিদায়ে যখন বর্ষা আসে, তখন প্রকৃতি যেন এক নতুন জীবন লাভ করে। রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ, সতেজ সবুজ পাতা আর কদম ফুলের স্নিগ্ধতা আমাদের বাঙালি প্রাণে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। সাহিত্যে বর্ষা যতটা রোমাঞ্চকর, আধুনিক বাস্তব জীবনে ততটাই চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরমভাবাপন্ন যুগে বর্ষাকাল আর কেবল রোমান্টিকতার বিষয় নয়; এটি এখন আমাদের টিকে থাকার এক কঠিন বাস্তবতা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট এবং নাগরিক অসচেতনতার কারণে বৃষ্টির আশীর্বাদ আজ অনেক ক্ষেত্রেই রূপ নিচ্ছে নিদারুণ দুর্ভোগে। তাই দুর্যোগের অপেক্ষা না করে, সময় থাকতে প্রয়োজন সুচিন্তিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি জরুরী।

বর্ষার প্রস্তুতির প্রথম ও প্রধান শর্ত হওয়া উচিত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে পানিবাহিত ও মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষার আতঙ্ক নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানের তথ্যমতে, এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে বংশবৃদ্ধি করে। বৃষ্টির পর ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ইমারত, ফুলের টব বা রাস্তায় পড়ে থাকা পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা সামান্য পানিই এই মশার জন্য আদর্শ প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে। তাই বর্ষা শুরুর আগেই প্রতিটি নাগরিকের উচিত নিজ উদ্যোগে বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা করা। এটি কেবল একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং নিজের ও পরিবারের জীবন বাঁচানোর এক অপরিহার্য পদক্ষেপ। অন্যদিকে, অনেক সময় সুয়ারেজ লাইন উপচে নোংরা পানি বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে পানযোগ্য পানিকে দূষিত করে ফেলে, যা ডায়রিয়া বা কলেরার মতো ভয়াবহ রোগের জন্ম দেয়। এ থেকে বাঁচতে পানি ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করে পান করার কোনো বিকল্প নেই।

শহুরে জীবনে বর্ষার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই যখন শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পানিতে তলিয়ে যায়, তখন জনজীবন অচল হয়ে পড়ে এবং অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে যায়। এর নেপথ্যে প্রকৃতির চেয়ে আমাদের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক উদাসীনতাই বেশি দায়ী। আমাদেরই ছুড়ে ফেলা পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেনগুলোতে জমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে অবরুদ্ধ করে দেয়। যদি শুকনো মৌসুমেই ড্রেনগুলো পরিষ্কার রাখার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া যায় এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলার মানসিকতা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি, তবে জলাবদ্ধতার এই অভিশাপ থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বর্ষায় বাড়ে কাঠামোগত ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁঁকি। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল বা পুরোনো তারের কারণে যেকোনো সময় মারাত্মক বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হতে পারে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে ভারী বৃষ্টি শুরুর আগেই বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগগুলো একজন দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এ ছাড়া বাড়ির ছাদে ফাটল থাকলে তা মেরামত করা প্রয়োজন, যাতে পানি চুঁইয়ে ভবনের স্থায়িত্ব নষ্ট না করে।

গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে বর্ষার প্রস্তুতি আরো ব্যাপক ও জীবনঘনিষ্ঠ। সেখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো বন্যা মোকাবিলা ও মাঠের ফসল রক্ষা। কৃষকদের আগাম নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হয়, যেন অতিবৃষ্টিতে ফসলের মাঠ তলিয়ে না যায়। গবাদিপশুর জন্য নিরাপদ উঁচু আশ্রয় ও পর্যাপ্ত গোখাদ্য মজুদ রাখা এ সময়ের অন্যতম প্রধান কাজ। বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষদের জন্য শুকনো খাবার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, স্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পলিথিনে মুড়িয়ে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা উচিত। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং সেই অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দুর্যোগের ঝুঁঁকি অনেকটা কমিয়ে আনতে পারে।

বর্ষাকাল প্রকৃতির এক নিয়ম, একে প্রতিহত করার বা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং প্রয়োজন পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা ও সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি। ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত- সবাই যদি নিজ নিজ নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকি, তবেই বর্ষাকাল তার চিরায়ত সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের মাঝে ধরা দেবে। প্রস্তুতিহীনতার মাশুল যেখানে জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতি, সেখানে সামান্য একটু সতর্কতা, যুক্তিপূর্ণ পদক্ষেপ ও সচেতনতা আমাদের জনজীবনকে করে তুলতে পারে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও প্রাণবন্ত।

বর্ষা মানেই যেনো মাঠে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুর খবরটি স্বাভাবিক! তবে একটি পরিবারই জানে কতটা অপূরনীয় ক্ষতি তাদের। বর্ষা সিজনে মাঠে কাজ করার সময় অবশ্যই আবহাওয়া বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে একজন কৃষকের। একটি জীবন শুধু একটি মানুষের জন্য নয়, একটি জীবন তার পরিবার-পরিজন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কোন মৃত্যুই কারো কাম্য নয়, সচেতনতাই পারে এ ধরনের মৃত্যু ঝুঁকি কমিয়ে আনতে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা বৈদ্যুতিক শকে আহত ব্যক্তিদের মতো। শরীর থেকে দ্রুত বৈদ্যুতিক চার্জ অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শরীরে ম্যাসাজ করতে হবে। আহত ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণে বিচলিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই ও বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাল গাছ জাতীয় সুউচ্চ প্রজাতির গাছ প্রচুর পরিমাণে খালি জায়গা বা মাঠের মধ্যে লাগাতে হবে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জেলা প্রশাসক থেকে মাইকিং করে বর্ষার বিষয়ে সর্তক করা হয়েছে এবং কৃষকদের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে ধান কাটার তাগিদ দিয়েছে। এটা রাষ্ট্রের পূর্ব-প্রস্তুতি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো নিউজ