ব্যাংক-বীমা ডেস্কঃ দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে এগিয়ে যাচ্ছে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। গ্রাহকের দীর্ঘদিনের বীমা দাবি নিষ্পত্তি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, অফিস কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস, ডিজিটালাইজেশন এবং দক্ষ ও তরুণ জনবল গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মচাঞ্চল্য।
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিন দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞ বিমাবিদ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মাদ সাইদুল আমিন।
প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ-এর দিকনির্দেশনা, পরিচালনা পর্ষদের মনিটরিং এবং সিইও মোহাম্মাদ সাইদুল আমিনের বাস্তবমুখী ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফ নতুন কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে ৭ কোটি টাকার বেশি বীমা দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের গ্রাহক পাওনা পরিশোধের এই উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায়
মোহাম্মাদ সাইদুল আমিনের বীমা পেশায় যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে। মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি বীমা খাতের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ২০২০ সালে মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০২৩ সাল থেকে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, গ্রাহকের প্রত্যাশা এবং বীমাকর্মীদের সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকায় তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারে বাস্তবভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমিশননির্ভরতা কমিয়ে বেতন কাঠামোয় কর্মীরা
প্রগ্রেসিভ লাইফের ব্যবস্থাপনায় অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো তৈরি।
দীর্ঘদিনের কমিশননির্ভর পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে কর্মী-কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রুপ ইন্স্যুরেন্স, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে তরুণ ও দক্ষ জনবলকে বীমা পেশায় আকৃষ্ট করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে একটি স্থায়ী ও কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠবে।
ইতোমধ্যে মাঠপর্যায় থেকে একঝাঁক তরুণ কর্মকর্তা-কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নতুন জনবল যুক্ত হওয়ায় ব্যবসা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে ইতিবাচক গতি তৈরি হচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা
ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, অপরিকল্পিত ও অকার্যকর অফিস পুনর্বিন্যাস এবং কার্যক্রমকে আরও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ চলছে।
একই সঙ্গে গ্রাহকসেবা দ্রুত ও কার্যকর করতে বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যক্রম, গ্রাহকসেবা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার মতে, ডিজিটালাইজেশনের ফলে সেবার গতি বাড়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি পাবে।
সংকট পেরিয়ে নতুন লক্ষ্যে
মোহাম্মাদ সাইদুল আমিনের মতে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট, বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে নানা জটিলতা এবং কর্মী-কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ব্যবসা প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তার ভাষায়, “২০২৬ সালে গত বছরের তুলনায় ব্যবসা দ্বিগুণ হবে—ইনশাআল্লাহ।”
গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই প্রধান লক্ষ্য
জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো গ্রাহকের আস্থা। দীর্ঘদিন দাবি নিষ্পত্তি না হলে সেই আস্থায় সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ফলে দাবি পরিশোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রগ্রেসিভ লাইফের বর্তমান ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়; বরং দাবি পরিশোধ, গ্রাহকসেবা, সুশাসন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটালাইজেশন এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই ছয়টি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানো।
গাজীপুর জেলার সদর উপজেলায় জন্ম নেওয়া মোহাম্মাদ সাইদুল আমিন দীর্ঘ কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় উঠে এসেছেন। দীর্ঘদিনের বীমা পেশার অভিজ্ঞতা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রগ্রেসিভ লাইফের বর্তমান ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য অতীতের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আধুনিক, গ্রাহকবান্ধব, সুশাসনভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
দাবি পরিশোধের মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রগ্রেসিভ লাইফের নতুন যাত্রা কতটা সফল হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।