জাতীয় ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলাদেশের অর্থনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের টানা পনেরো বছরের শাসনামলে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। সরকারি সহায়তায় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) অর্থায়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক শিল্পনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশটি প্রমাণ করেছিল যে স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব। এই ১৫ বছরে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬.৩%।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণ করার জন্য নির্ধারিত তিনটি শর্তই পূরণ করেছিল। চরম দারিদ্র্য এক অঙ্কে নেমে এসেছিল এবং সামাজিক খাতে বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল এগিয়ে। নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে ছিল।
কিন্তু এই অগ্রগতি এখন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার নেতৃত্ব দেন Muhammad Yunus। সরকার গঠনের সময় তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সেই প্রতিশ্রুতির ন্যূনতম প্রতিফলনও দেখা যায়নি। বরং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে।
এই আলোচনায় তুলে ধরা হবে কীভাবে অন্তর্বর্তী সরকার একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কষ্ট বেড়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া
FY2009-10 থেকে FY2023-24 পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.২৪%। এই সময়ে মাথাপিছু আয় ২০০৯ সালের $৭৫৯ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে $২,৭২৮-এ পৌঁছায়।
কিন্তু FY2025 সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩.৪৯%, যা FY1991-92 সালের পর সর্বনিম্ন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরিও আগের বছরের তুলনায় কমে গেছে।
দারিদ্র্য বৃদ্ধি
FY2009-10 থেকে FY2023-24 পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার প্রতিবছর গড়ে ০.৭৫% হারে কমছিল। কিন্তু পরবর্তী বছরে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়।
Asian Development Bank এর হিসাব অনুযায়ী ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭%, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২৭.৯৩% হয়েছে। ফলে আরও প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে।
রপ্তানি কমে যাওয়া
শ্রম অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং পূর্ববর্তী সরকারের সাথে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার কারণে ২০২৫ সালের শেষ দিকে টানা চার মাস রপ্তানি কমে যায়।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ১০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ৬০ হাজার মানুষ চাকরি হারায়।
ব্যাংকিং খাতের সংকট
অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর ফলে অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে চলে যান অথবা আত্মগোপনে চলে যান।
ফলে তাদের ঋণের মূলধন ও সুদ পরিশোধ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে খেলাপি ঋণের হার (NPL) বেড়ে মোট ঋণের ৩৫%-এরও বেশি হয়ে যায়। এর ফলে ঋণ বিতরণ কমে যায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগ গত দশ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ১২.৬%।
বেকারত্ব
২০২৫ সালে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ৪.৬% থেকে ৫% এর মধ্যে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Bangladesh Bureau of Statistics এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬.২ লাখ মানুষ বেকার ছিল এবং ২০২৫ সালে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
দারিদ্র্যের অবস্থা
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে ২০২৫ সালে দারিদ্র্য বেড়েছে।
Power and Participation Research Centre এর মতে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭% থেকে বেড়ে ২৭%-এর বেশি হয়েছে।
World Bank তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল হিসাব দিয়ে বলেছে যে ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার হবে ২২.৯% এবং চরম দারিদ্র্য বেড়ে ৯.৩৫% হয়েছে।
২০২৫ সালের UNICEF রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ২৮.৯% শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে।
মূল্যস্ফীতি
২০২৫ সালে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ ছিল—
টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি
Bangladesh Bureau of Statistics অনুযায়ী FY25 সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০.০৩%।
Bangladesh Bank মুদ্রানীতি কঠোর করে নীতিগত সুদের হার বাড়ালেও এর প্রভাব সীমিত ছিল এবং ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৬%-এর বেশি হয়ে যায়।
বেসরকারি বিনিয়োগ
FY25 সালে বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে আসে জিডিপির ২২.৪৮%-এ, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এর প্রধান কারণ:
উচ্চ মূল্যস্ফীতি
উচ্চ সুদের হার
ডলারের সংকট
গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬.২৩%।
বিদেশি বিনিয়োগ
২০২১ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ অর্ধেকেরও কমে গেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১% বাড়াতে বছরে কমপক্ষে ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। অথচ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লক্ষ্য ছিল জিডিপির ৩%, কিন্তু তা ১%-এরও কম রয়েছে।
রাজস্ব ঘাটতি
National Board of Revenue FY2025-26 সালে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় ৬০,১১০ কোটি টাকা।
মোট সংগ্রহ ছিল ২.২৪ লাখ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৭% কম।
গত অর্থবছরে সরকারের নিয়মিত ব্যয় রাজস্ব আয়ের তুলনায় ২৩,০০০ কোটি টাকা বেশি হয়েছে—যা গত ৪০ বছরে বিরল ঘটনা।
এডিপি বাস্তবায়ন কমে যাওয়া
FY2025-26 এর প্রথম ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল মাত্র ১৭.৫%, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তা ২১.২% এ পৌঁছায়, যা ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিল
বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও IPP-দের কাছে বকেয়া বিল ৭৪,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ৮-১০ মাস ধরে বিল না পাওয়ায় জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না, ফলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ তা বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে এর প্রধান কারণ—
আমদানি কমে যাওয়া
বিনিয়োগ কমে যাওয়া
এডিপি বাস্তবায়ন কম হওয়া
রেমিট্যান্স বৃদ্ধি
ড. ইউনুসের ব্যক্তিগত সুবিধা
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও Muhammad Yunus বিভিন্ন ব্যক্তিগত সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. ৬৬৬ কোটি টাকার বকেয়া আয়কর সংক্রান্ত রায় প্রত্যাহার
২. শ্রম আদালতের ২৬টি মামলা প্রত্যাহার
৩. বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে PSP লাইসেন্স গ্রহণ
৪. গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি
৫. গ্রামীণ নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের অনুমতি
৬. গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস নামে জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স
৭. Grameen Bank-এ সরকারের অংশীদারিত্ব ২৫% থেকে কমিয়ে ১০%
৮. National Board of Revenue থেকে পাঁচ বছরের কর মওকুফ
৯. Starlink-কে বাংলাদেশে ব্যবসার লাইসেন্স (Grameenphone এর সহযোগিতায়)
১০. নোবেল পুরস্কারের অর্থের উপর কর অব্যাহতি
১১. ২০২৫ সালে Grameenphone ৩৩০% লভ্যাংশ ঘোষণা করে, যার মোট পরিমাণ প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা।
ড. ইউনুসের কোম্পানি Grameen Telecom এর মাধ্যমে গ্রামীণফোনে ৩৪.২% অংশীদারিত্ব রয়েছে।