রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের করা তিনটি পৃথক দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। প্রতিটি মামলায় সাত বছর করে সাজা হওয়ায় সর্বমোট কারাদণ্ডের মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ২১ বছর।
বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ২৩ নভেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করা হয়েছিল।
এই তিন মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ছিল ৪৭ জন, যদিও ব্যক্তি গণনায় এই সংখ্যা ২৩। শেখ হাসিনা ছাড়াও তাঁর সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাখার পরিচালক ও উপপরিচালক অসংখ্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এসব মামলার আসামি ছিলেন।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, পূর্বাচল প্রকল্পে নির্ধারিত নিয়ম উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে প্লট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। তদন্তে তুলে ধরা হয়, এসব বরাদ্দের জন্য স্বচ্ছতার প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনাসহ তিন মামলার মোট ২০ জন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে রয়েছেন- সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা, রাজউকের বিভিন্ন শাখার চারজন সাবেক সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, রাজউকের একাধিক পরিচালক ও উপপরিচালক।
৩ মামলার মধ্যে একমাত্র গ্রেপ্তার অবস্থায় থাকা আসামি ছিলেন রাজউকের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।
গত ৩১ জুলাই আদালত অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। এর পর কয়েক মাস ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক চলে। ১৭ নভেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর দ্রুতই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা হয়।
দুদক বছর শুরুর দিকে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত একই ধরনের অভিযোগে মোট ছয়টি মামলা করেছিল। সেসব মামলার অর্ধেকের রায় হলো আজ। বাকি তিনটির বিচার এখনো চলমান।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় বুধবার রাত থেকেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয় আদালত ভবন, আশপাশের সড়ক ও প্রবেশপথে। কোনো ধরনের উত্তেজনা বা ভিড় ঠেকাতে সীমিত প্রবেশের নির্দেশনা ছিল।
মাত্র ১০ দিন আগে, ১৭ নভেম্বর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-কে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলার আরেক আসামি, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অ্যাপ্রুভার হিসেবে ৫ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।
এ দুই ধরনের মামলার রায় মিলিয়ে বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারব্যবস্থার জন্য একটি অতি সংবেদনশীল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্বাচল প্রকল্পে যেভাবে নিয়মভঙ্গ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এসব বিষয়ে অভিযোগ ছিল, তবে তদন্ত শুরুর পর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়।
বিচার ও প্রশাসনিক বিষয়ে জড়িত বিশেষজ্ঞদের মত, এই রায় বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ‘দায়মুক্তি সংস্কৃতি’ ভাঙার ইঙ্গিত দেয়। তারা বলছেন, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর হলে জনআস্থা ফিরে আসতে পারে।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে আসামিদের। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারেন। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রায় বহাল থাকবে।