জাতীয় ডেস্ক রিপোর্টঃ জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের প্রায় দুই বছর পর আবার বসছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিবেশন। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার ছাড়া শুরু হচ্ছে সংসদের যাত্রা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, অধিবেশন শুরুর সময় স্পিকারের চেয়ার শূন্য থাকবে এবং একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে কার্যক্রম শুরু হবে।
বেলা ১১টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী দিক তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণ মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পর সংসদ সদস্যরা তা নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার ভাষণের বিরোধিতা করেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যদিও বিএনপি বলেছে, সংসদীয় বিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ হবে এবং এতে কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।
অধিবেশন শুরু হওয়ার পরপরই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাব উত্থাপন করবেন এবং একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। এরপর ভোটের মাধ্যমে স্পিকার নির্বাচিত হবেন। একইভাবে ডেপুটি স্পিকারও নির্বাচিত হবেন। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি তাদের শপথ পাঠ করাবেন। শপথগ্রহণের জন্য অধিবেশন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি হতে পারে।
এরপর নবনির্বাচিত স্পিকার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন এবং সংসদের কার্যপ্রণালি নির্ধারণের জন্য সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটিই অধিবেশনের সময়কাল ও কার্যসূচি নির্ধারণ করবে। একই অধিবেশনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও গঠন করা হতে পারে। সংসদের প্রথম বৈঠকে শোক প্রস্তাবও গৃহীত হবে। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সাবেক সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সংসদ সচিবালয়ের প্রয়াত কর্মকর্তাদের স্মরণে এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। পরে এক মিনিট নীরবতা পালন ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেন। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ছয় মাস আট দিন। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি ওই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হলেও তা শেষ হয়নি। এর আগেই অভ্যুত্থানের ক্ষমতা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সংসদটি ভেঙে দেন। এরপর প্রায় দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।
নতুন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে যার মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন যার মধ্যে জামায়াতের আসন ৬৮টি। ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এদিকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব সংসদ নেতা তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে সংসদ নেতা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে এখনও বিরোধী দলের কাছ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
ডেপুটি স্পিকার পদের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই সনদে বিরোধী দল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা খণ্ডিতভাবে কিছু চাই না, পুরো প্যাকেজ বাস্তবায়ন চাই।’
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশও সংসদের প্রথম অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে। চিফ হুইপ জানিয়েছেন, এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা থাকবেন। কমিটি সুপারিশ করবে কোন অধ্যাদেশ বহাল থাকবে এবং কোনগুলো বাতিল হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সংসদ ভবন এলাকায় অস্ত্র, বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর দ্রব্য বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে কোনো ধরনের সমাবেশ, মিছিল বা বিক্ষোভও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।